করোনা কালের জমানো কথা!

কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম এতদিনের জমানো ভাবনা গুলো সবার সাথে ভাগ করে নিবো। মনোযোগ দিতে পারছিলাম না, অবশেষে লিখেই ফেললাম।

২৫ শে মার্চ ছিল দেশব্যাপী লক ডাউন এর আগে আমাদের শেষ অফিস। এর এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমাদের অফিসে ওয়ার্ক ফ্রম হোম সার্কুলার চলে এসেছিল গ্রুপ থেকে। তাই সবাই মোটামুটি বাসা থেকে কাজ করার চেষ্টা করছিল। আমরা যে কয়জন অফিসে এসে ছিলাম তারা আসলে মনের মধ্যে একটা শঙ্কা নিয়ে অফিস করছিলাম, সবাই সবার থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছিলাম। সবাই চেষ্টা করছিল নিজের কাজগুলো গুছিয়ে কত দ্রুত ঘরে ফিরে যাওয়া যায়। কাজ গুছিয়ে অফিস থেকে বাসায় আসতে আসতে বিকাল হয়ে গেল।এসে মাগরিবের নামাজ পড়ে ভাবতে ছিলাম হয়তো খুব দ্রুতই এটা শেষ হয়ে যাবে কিন্তু তখনও বুঝতে পারি নাই, এটার ভয়াবহতা দেখার অনেক বাকি আছে। আজ লকডাউন এক মাস পার হয়ে গেছে। ইমার্জেন্সী ছাড়া বাইরে যেতে পারছিনা, সব সময় একটা ভয় কাজ করছে এই বুঝি আমি আক্রান্ত হলাম। ভাগ্যিস অনলাইন শপ গুলো চালু ছিল যারা চাল, ডাল থেকে শুরু করে শাক-সবজি, মাছ, মাংস সবকিছু বাসায় দিয়ে যাচ্ছে যদিও ডেলিভারি ম্যান দের সেফটি নিয়ে আমি কনসার্ন কারণ এখন ওরাই বেশি ভালনেরাবল ডাক্তার দের মত। যখন অফিস করতাম সকাল আটটায় বেরোতাম আসতে আসতে রাত আটটা বেজে যেত।তখন সব সময় মনে হতো একটু অবসর পেলে, একটু ছুটি পেলে মনে হয় ভাল লাগবে। নিজের মতো করে কিছু সময় কাটাতে পারব। একটু অবসর পেলে সকালবেলা এক কাপ চা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে বসে পছন্দের কিছু বই পড়তাম আর পাখির কলকাকলি শুনে সময় কাটাতাম। শুধু ভাবতাম এই ব্যস্ততার বুঝি আর শেষ নেই, কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন অন্য ভাবে। অবশেষে যখন অবসর পেলাম করোনা উপলক্ষে কিন্তু সেটা অবসর বললে ভুল হবে, শুধুমাত্র বিষন্ন চিত্তে ভালো দিনের অপেক্ষা মাত্র।

এখন দিন শুরু হয় অনলাইন এ ঢুকে করোনার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার মাধ্যমে । বিভিন্ন করোনা সংক্রান্ত খবর পড়ে। মানুষের কষ্টের কথা, করোনার ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কার এর চেষ্টার কথা, কত মানুষের জানাজা দেয়ার মানুষ নেই, ছেলে মেয়েরা তার বৃদ্ধ মাকে বনে ফেলে রেখে আসছে করোনা হওয়ার ভয়ে, কত মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেনা এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে ছুটছুটি করে মারা যাচ্ছে এই সব জেনে। করোনা আমাদের মানবিকতার পরীক্ষা নিচ্ছে, কেউ পাশ করছে আবার কেউ বুঝিয়ে দিচ্ছে এতদিন তাদের ভালোবাসা ছিল অভিনয় মাত্র। আমরা এতদিন পারিবারিক বন্ধন নিয়ে গর্ব করতাম সেটাও এখন আসল রূপ দেখাতে শুরু করেছে।

প্রতিদিন দুপুর দুইটার দিকে যখন করোনা নিয়ে ব্রিফিং হয় সেটার জন্য অপেক্ষা করি, আশঙ্কায় থাকি এই বুঝি আরো কত মানুষ আক্রান্ত হল। কত মানুষ মারা গেলো। সবচেয়ে ভয় হয় একবার যদি আমি বা আমার কাছের কেউ আক্রান্ত হয় তাহলে করোনা হওয়ার যে কষ্ট তার চেয়ে বেশি কষ্ট হবে সামাজিক বঞ্চনার। এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করলে খারাপ লাগে, দুশ্চিন্তা হয় তাই এখন এটা নিয়ে চিন্তা করা বাদ দিয়ে দিয়েছি শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েছি যতটুকু পারি সতর্ক থাকবো, সচেতন থাকবো আর আল্লাহতালার উপর ভরসা করব।আজকাল আরো একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি, এই করোনা একদিন নিশ্চয়ই শেষ হয়ে যাবে যখন সকল মানুষ আবার কাজে ফিরবে তখন কি এই পরিবেশ, এই মানুষ গুলো কি আগের মত থাকবে নাকি অনেক কিছু বদলে যাবে। যাইহোক সময় ই আমাদের বলে দিবে কি হবে। অবশ্য একটা ভালো দিক ও খুঁজে পেয়েছি। এই বছর বই মেলায় অনেক বই কিনে রেখেছিলাম একটু সময় পেলে পড়ে ফেলবো ভেবে। সময় পেয়ে গেলাম, এখন সব গুলো এক এক করে পড়ার চেষ্টা করছি। আগে কিছু অনলাইন কোর্স এ রেজিস্ট্রেশন করে রেখেছিলাম করব বলে, এখন কোর্স করা শুরু করেছি ভালোই লাগছে। আগের যে স্কিলগুলোতে ঘাটতি ছিল সেই স্কিলগুলো অনলাইনে ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখে বা বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করে ঘাটতিগুলো পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কারণ করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে আসলে কিভাবে নিজেকে খাপ খাওয়াবো, আরো বেশি অবদান রাখতে পারব সেটাই ভাবছি।
মোঃ হাফিজুর রহমান

No comments:

Translate

লিচুর রাজ্য ঈশ্বরদীতে

আমাদের গ্রামের রাস্তার দুধারে যত দুর চোখ যায়, শুধু লিচু বাগান চোখে পড়বে, অন্য কোন ফল বাগান বা ফসল খুব একটা দেখা যায় না। লিচুর যখন মুকুল আসে ...

Powered by Blogger.